স্মৃতিচারণ: সাংবাদিক শ্যামলদার জন্মদিন-সঞ্জয় সরকার

আমি তখন শিক্ষানবীশ সাংবাদিক। দৈনিক বাংলার দর্পণে এটা-সেটা লিখি। জনকণ্ঠের তৎকালীন সাংবাদিক মাসুম ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরিফিরি। প্রতিদিন সকালে ইত্তেফাকসহ কয়েকটা পত্রিকা হাতে নিয়ে সিটি আর্ট প্রেসে এসে বসেন শ্যামলদা। মাসুম ভাই আর আমি তার কাছ থেকে নিয়ে একটার পর একটা পত্রিকা পড়ি। চা খাই। শ্যামলদা নিউজপ্রিন্টের প্যাডে নিউজ লেখেন। তিনি কিভাবে লেখেন- আমরা তা দেখি।
একদিন খবর এল, দৈনিক সংবাদ-এ নেত্রকোনার জন্য একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। মাসুম ভাই শ্যামলদাকে আমার কথা বললেন। এরপর একদিন শ্যামলদা আর ময়মনসিংহের জিল্লুর ভাই (প্রয়াত সাংবাদিক জিল্লুর রহমান খান) আমাকে নিয়ে হাজির হলেন ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে অপেক্ষমান মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল ভাইয়ের সামনে। আমি তখন কলেজ বয়। আরও ছিপছিপে। আমাকে দেখেই দুই চোখ বড় করে ড্যাব ড্যাব করে তাকালেন সংবাদের তখনকার মফস্বল সম্পাদক কার্ত্তিক দা। বললেন, ‘আরে ও তো খুবই ছোট। ও কিভাবে পারবে?’ বুলবুল ভাই বললেন, ‘কাজ করতে থাকুক। মনে হয় পারবে ও।’
এরপর থেকে শ্যামলদা আর মাসুম ভাইয়ের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকি। অফিস পাড়ায় তখন সাংবাদিক বলতেই শ্যামলদা। সবাই তাকে খুব সমীহ করেন। মনে আছে, একদিন শ্যামলদার সঙ্গে জেলা কৃষি অফিসে যেতেই ডিডি সাহেব বলে উঠলেন, ‘আরে! শ্যামল বাবু, আপনার ছেলে নাকি?’ আমি বিব্রত হই। পরিচয় জানার পর বিব্রত হন ডিডি সাহেব নিজেও। শুধু কৃষি অফিসেই না, শ্যামলদার সঙ্গে ঘুরেফিরে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে মাঝেমধ্যেই পড়তে হতো আমাকে।
তখন এখনকার মতো ইন্টারনেট, ফ্যাক্স, মোবাইল ইত্যাদি ছিল না। বড় ধরনের কোনো জরুরী সংবাদ থাকলে পাঠাতে হতো ট্যালেক্স অথবা টেলিফোনে। আর কম গুরুত্বর্পূণ নিউজ পাঠাতাম ডাকযোগে, বুকপোস্টে। ট্যালেক্সের জন্য ঘটনার বিবরণ ইংরেজিতে লিখতে হতো। শ্যামলদা লিখতেন। বড়পুকুর পাড়ে টেলিগ্রাম অফিসে গিয়ে তিনি প্রথমে তার অফিসে পাঠাতেন। এরপর আমরা তার লেখাটাই হুবহু আমাদের অফিসে পাঠিয়ে দিতাম। অপারেটর লিখে দিতেন, ‘সেইম এজ ইত্তেফাক।’
মাঝেমাঝে আবার ট্যালেক্স মেশিন বিকল থাকতো। অথবা সংযোগ পাওয়া যেত না। তখন আমরা শ্যামলদার পিছনে লেগে থাকতাম। ভাবতাম তিনি একটা না একটা বিহিত করবেন। ডিসি অফিস, ডিসি সাহেবের বাংলো, এসপি অফিস, ইফাদ, এলজিইডি, সওজ বা কোনো না কোনো জায়গায় আমাদের নিয়ে ঠিকই হাজির হতেন তিনি। সেখান থেকে আমরা টেলিফোনে নিউজ পাঠাতম। তখন ফোন কলের মিনিট প্রতি রেট ছিল ১৮ টাকা। কখনও যদি বাইরের দোকান থেকে নিউজ পাঠাতে হতো, তখন এক নিউজেই ফাঁকা হয়ে যেতো পকেট।
আগেই বলেছি, অফিসপাড়ায় তখন শ্যামলদার বিরাট আধিপত্য। একটি গুরুত্বর্পূণ অফিসের এক কর্মচারী প্রতিদিন বিকেলে শ্যামলদাকে দেখেই চেয়ার ছেড়ে দূরে চলে যেতেন। এটা ওই অফিসের অঘোষিত রুটিনে পরিণত হয়েছিল। এরপর টেলিফোন হাতে নিয়ে দিনের যতো নিউজ- সব অফিসে পাঠিয়ে দিতেন দাদা। আর আমরা হা করে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, কবে যে আমাদের এমন আধিপত্য হবে। আমরা দাদার অনুকম্পার অপেক্ষায় থাকতাম। তিনি একটু সুযোগ করে দিলেই তবে আমরা নিউজ পাঠাতে পারতাম। এক্সক্লুসিভ কিছু থাকলে মাঝে মাঝে দাদা হাওয়া হয়ে যেতেন। আমাদের ফাঁকি দিতেন। তখন আমরা পড়তাম ঘোর বিপদে। ইত্তেফাকে সবচেয়ে বেশি নিউজ ছাপা হতো যে কজন সংবাদদাতার, তাদের মধ্যে শ্যামলদা ছিলেন শীর্ষস্থানীয়।
আমলা, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সমাজকর্মী সবাই শ্যামলদাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। এক কথায়, এই শহরে সাংবাদিক বলতেই ছিলেন শ্যামলদা। আরও অনেকে থাকলেও তার মতো আধিপত্য কারও ছিল না। আপদেবিপদে তার কাছেই যেতাম আমরা। এখনও যাই। তিনি আগেও সহযোগিতা করতেন। এখনও করেন। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিষ্যের সংখ্যা অগুন্তি। অবশ্য আমরা অনেকে তা আজ স্বীকারই করি না।
তখনকার দিনে ঢাকা থেকে কোনো সাংবাদিক বা কবি-লেখক এলে প্রথমেই যার কাছে ছুটে যেতেন, তিনি হচ্ছেন শ্যামলেন্দু পাল। বড়বড় কর্তা বা রাজনীতিবিদরা নেত্রকোনায় এসে প্রথমে যে সাংবাদিককে ফোন করতেন তিনিও শ্যামলেন্দু পাল। আঞ্চলিক পর্যায়ে থেকেও জাতীয় পর্যায়ের অনেকের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেছিলেন তিনি।
আমার অভিজ্ঞতা বলে, সাংবাদিকতা এমন এক পেশা, যেখানে শিষ্যরা সচরাচর গুরুকে স্বীকার করে না। উপরন্তু সুযোগ পেলে গুরুর মাথায় কাঁঠাল ভাঙে। শ্যামলদার সঙ্গে আমরা অনেকেই তা করেছি। এখনও করি। দাদা এগুলো মনে রাখেন না। বেশি প্যাঁচগোজের মানুষ নন তিনি। কেউ দুর্ব্যবহার করলে দুদিন পরই ভুলে যান। এ কারণে আমরাও পার পেয়ে যাই। আসলে এটাই মহৎ মানুষের গুণ।
আমরা যারা অল্প প্রতিষ্ঠা পেয়েই আত্মম্ভরিতা বা আত্ম-অহমিকায় ভূগি, নিজেকে অনেক বড় ভাবি, সবাইকে ড্যামকেয়ার করি, তাদের চিন্তা-চেতনার চেয়ে অনেক উর্ধের মানুষ তিনি।
আবার মনে হয় তিনি কিছুটা অগোছালো মানুষও। কাগজপত্র কিছুই গুছিয়ে রাখতে পারেন না। ব্যক্তি জীবনেও এমনই। একজন বড় মাপের ছড়াকার হয়েও সেদিকে প্রতিষ্ঠা পাবার কথা মাথায় আনেননি। উচ্চ শিক্ষিত হয়েও সরকারি চাকরিতে যাননি। চাইলে তখনকার সময়ে নিঃসন্দেহে বড় কোনো চাকুরে হতে পারতেন। সাংবাদিকতায়ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ ছিল তার। কিন্তু কিছুই করেননি। এক পত্রিকার জেলা সংবাদদাতা হিসেবেই কাটিয়ে দিয়েছেন র্দীঘ প্রায় ৬০ বছর। ইত্তেফাক দিয়ে শুরু। হয়তো ইত্তেফাকেই শেষ।
পরিশেষে বলব, শ্যামলদা শ্যামলদাই। তার তুলনা হয় না। স্বীকার করি আর না করি, নেত্রকোনার সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি। সেখানে অনেকদিন পর্যন্ত জ্বলজ্বল করে জ্বলবে শ্যামলেন্দু পাল-এর নাম।
আজ প্রিয় শ্যামলদার জন্মদিন। তাকে অনেক অনেক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। অনেক অনেক শুভকামনা
তার জন্য।
সঞ্জয় সরকার
১৭ জানুয়ারি ২০২৪
May be an image of 1 person

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।