নেত্রকোণার ২২ হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান নষ্ট হয়েছে

স্টাফ রির্পোটার: রোববার সন্ধ্যার আচমকা গরম বাতাসে নেত্রকোণা জেলার অন্তত ২১ হাজার ৬৮৮ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতি হয়েছে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন স্থানীয় কৃষকরা। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এরিমধ্যে গাজিপুর ধান গবেষণা ইনস্ট্রিটিউট থেকে রোগ তত্ব বিভাগের প্রধান সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আশিক ইকবাল খানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল জেলার মদন, খালিয়াজুরী, মদন ও কেন্দুয়ার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
স্থানীয় কৃষক, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলার ১০টি উপজেলায় এবছর ১ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে জেলার হাওরাঞ্চলে মোট ৪০ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করা হয়। এরমধ্যে হাইব্রীড (হীরা) জাতের ধান, বিআর ২৯ ধানে ক্ষতি বেশি হয়েছে। হাওরাঞ্চলে হাইব্রীড (হীরা) জাতের ধান মোট ১০ হাজার ৩৩০ হেক্টর ও ব্রিআর ২৯ জাতের প্রায় ৭ হাজার ৮শ হেক্টর জমি রোপন করা হয়েছে।
রোববার সন্ধ্যায় হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী গরম বাতাস শুরু হয়। বাতাস যে দিকে প্রবাহিত হয়েছে সেদিকে বোরো ধানের খেতের শীষ মরে (শুকিয়ে) গেছে। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে জেলায় অন্তত ২১ হাজার ৬৮৮ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এরমধ্যে মদনে ৫ হাজার ৯৫৮ হেক্টর, খালিয়াজুরিতে ১০ হাজার হেক্টর, মোহনগঞ্জে ১৫০ হেক্টর, কেন্দুয়ায় ৩ হাজার ১৪ হেক্টর,বারহাট্টায় ১ হাজার ১২০ হেক্টর, কলমকান্দায় ২০০ হেক্টর, দুর্গাপুরে ৯৮০ হেক্টর, আটপাড়ায় ৫৫০ হেক্টর, পূর্বধলায় ১০ হেক্টর এবং সদর উপজেলায় ২০ হেক্টর জমি রয়েছে।
খালিয়াজুরির বোয়ালী গ্রামের কৃষক সারোয়ার আলম জানান, রোববার সন্ধ্যার পর শুধু গরম বাতাস ছিল। কোনো রকম ঝড় বৃষ্টি ছিল না। বাতাসটা অসহ্য মনে হচ্ছিল। সকালে রোদ ওঠার পর হাওরে গিয়ে দেখি গাছে থোড় (শীষ) আসা ধান মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। বেশি ফলনের আশায় হাইব্রিড জাতের ধান রোপন করেছিলাম। কিন্তু এখন আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
ওই উপজেলার বল্লভপুর গ্রামের কৃষক হেলাল মিয়া বলেন, হঠাৎ করে গরম বাতাস। ৬০ বছরের জীবনে এমন গরম বাতাস আর কখনো দেখি নাই। সকালে ঘুম থাইক্কা উঠে দেখি খেতের সব ধান মরে গেছে। আমরা কী খাইয়া বাঁচবো। ঋণ করে গিরস্থি করেছি। এখন কি করে ঋণ দেব, কীভাবে সারা বছর সংসার চালাইব।’


খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করে শুরু হওয়া গরম বাতাসটি যেদিকে অতিক্রম করে যে দিকে গেছে সে দিকেই বোরো ধানের নতুন শীষের ক্ষতি হয়েছে। তবে যে সব খেতে ধানের শীষ এখনো বের হয়নি বা সে সব শীষে ধান দানা হয়েছে সেগুলো ক্ষতি হয়নি।’
বারহাট্টার কৃষি কর্মকর্তা মোমাইনুর রশিদ জানান, ওই উপজেলায় ১৪ হাজার ৯৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি ধান ক্ষতি হয়েছে। যে সব ধান গাছের শীষে রোববার ভোর থেকে সন্ধ্যায় গরম বাতাস প্রবাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ফুল ফুটে বা পরাগায়ন হয় সে সব খেতের ধান শতভাগ ক্ষতি হয়েছে। এ সব ধানে চিটা ছাড়া আর কিছুই হবে না।
মদন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রায়হানুল হক জানান, ‘গরম বাতাস ছাড়া বৃষ্টি কিংবা শিলা বৃষ্টি হলেও ধানের এমন ক্ষতি হতো না। মাঠের যে ধান গাছগুলোতে ফ্লাওয়ার এসেছিল সেগুলো আজ রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির ধান ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। আমরা কৃষকদের জমিনে পানি ধরে রাখার পরার্মশ দিচ্ছি। এতে কিছুটা রক্ষা হতে পারে।’


এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘গরম বাতাসে ধানের প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এমন ঘটনা আগে কখনো হয়নি। আমি বেশ কিছু এলাকা পরিদর্শন করেছি। মঙ্গলবার সকালে গাজীপুর ধান গবেষণা ইনস্ট্রিটিউট থেকে বিজ্ঞানীরা এসেছেন। তারা মদন, খালিয়াজুরী ও কেন্দুয়ার বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরীক্ষা করছেন। তারা প্রাথমিকভাবে বলছেন এটা হিট ইঞ্জুরির জন্য হয়েছে।’
গাজিপুর ধান গবেষণা ইনস্ট্রিটিউট থেকে রোগ তত্ব বিভাগের প্রধান সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোঃ আশিক ইকবাল খান এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, “আবহাওয়া পরিবর্তনের (ক্লাইমেট চেঞ্জ) কারণেই এই ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় বৃষ্টিপাত হচ্ছিল না। যদি বাতাসের সাথে বৃষ্টি হতো তাহলে এই ক্ষতি হতো না। আমরা মানুষজনের সাথে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছেন হাইব্রীড জাতের ধান যেগুলো এই মুহুর্তে থোড় বেরুচ্ছে। শুধুমাত্র সেগুলোই হিট ইঞ্জুরিতে ক্ষতি হয়েছে। দীর্ঘসময় বাতাস হলেও রোববার রাত নয়টার দিকে গরম বাতাস প্রবাহিত হয়েছিল। এই বাতাসেই ধানের ক্ষতি হয়েছে। ”

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।