স্বপ্নের পদ্মা সেতু মুজিববর্ষের সেরা উপহার-এডভোকেট আব্দুল হান্নান রঞ্জন

বিজয় দিবস-২০২০। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর জন্মশত বার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বে সদাসয় সরকার ষোষিত মুজিব বর্ষে আমরা এবারের বিজয় দিবস ভয়াবহ করোনা ভাইরাস সংক্রমণকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে একটু ভিন্নভাবে উৎযাপন করতে যাচ্ছি।
এবারের বিজয়ের মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা’র সরকার দেশবাসীকে উপহার দিচ্ছেন নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত “স্বপ্নের পদ্মা সেতু”। বাঙালি জাতির বিজয়ের অহংকার, গৌরবের ইতিহাস এই পদ্মা সেতু।
বাঙ্গালী জাতির তথা বাংলার মানুষের প্রানপ্রিয় নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন বিশাল ব্যক্তিত্ব আর বিচক্ষণ ও সাহসী নেতৃত্বের গুনাবলীতে সমৃদ্ধ বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক, শোষিত, বঞ্চিত লাঞ্চিত বাঙ্গালীর মুক্তির দূত। তিনি ছিলেন বাঙালির চিরকালের লালিত আস্থা, বিশ্বাস, স্বপ্ন, আশা-আখাঙ্খা, ভরসা ও চেতনা জাগরণে বাঙালী জাতির সাহস ও স্বাধিকার আন্দোলনের নায়ক, স্বাধীনতা সংগ্রামের সমন্বয়ক, মহানায়ক।
শোষিত, বঞ্চিত বাঙালি জাতির দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণমানুষের হৃদয়ে যে স্বপ্ন আর চেতনা জাগিয়েছিলেন তা পরবর্তীতে তিনি নিজেই সম্পুর্ন পরিকল্পিতভাবে এবং পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করে গেছেন রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পাক-হায়েনাদের পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জনে এবং বাঙালি জাতির জাতিসত্বা বিনির্মানে তিনিই মহানায়ক।
বঙ্গবন্ধু, বাঙ্গালী, বাংলাদেশ একসূত্রে গাঁথা। বাঙালী মানেই বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। যা লাল-সবুজের পতাকায় দৃশ্যমান সাক্ষ্যে মানুষের মনে প্রেরণা জাগিয়ে তোলে, দেশপ্রেমে উদ্ভোুদ্ধ করে অদম্য সাহসে পথচলায় সুন্দর, শান্তিময় বাসযোগ্য আগামীর পথে।
শোষিত বঞ্চিত বাঙ্গালি জাতির লালিত স্বপ্ন পূরনে দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু ২৩ বছর জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করছেন, যৌবনের ১২টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন বাঙালির আস্থা, বিশ্বাস আর ভালবাসায়। অর্থ, বিত্ত, লোভ লালসা বা ক্ষমতার লোভ কখনও তাকে স্পর্শ করতে পারে নি।
তাঁর প্রতি বাঙালি জাতির অভাবনীয় আস্থা, অবিচল বিশ্বাস আর ভালবাসার ফসলই আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু’র প্রতি বাঙ্গালী জাতির অঘাধ বিশ্বাস, অবিচল আস্থা আর অকৃত্রিম ভালবাসা ছিল বলেই ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কতিপয় চিহ্নিত দূসর বাদে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী তাঁর ডাকে ” জয় বাংলা “শ্লোগানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল, ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল, দু’লক্ষ মা-বোন ইজ্জ্বত দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলার দামাল ছেলেরা বিশেষ করে ছাত্র,যুবক, শ্রমিক, কৃষকসহ সকল পেশার মানুষই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধারা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে দেশকে হানাদার মুক্ত করে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বাধীন করে বাংলার মাটিতে লাল-সবুজের উড়ায়। “দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা – এ কারোব দান নয়”-এখানেই কবির এই ঐতিহাসিক উক্তির সার্থকতা।
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তঝরা নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন করতে বাঙ্গালী জাতি যে রক্ত দিয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোন দেশ স্বাধীন করতে এত রক্ত কেউ দেয় নি”। আর পৃথিবীতে এত কম সময়ে কোন দেশ স্বাধীন হয় নি। আমার বাঙালি প্রমাণ করেছে বাঙ্গালী বীরের জাতি।
বঙ্গবন্ধুর সূদৃঢ় নেতৃত্ব যখন যোদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্ত অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ বিনির্মানে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে এগিয়ে নিচ্ছিলেন ঠিক সেই মুহুর্তে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির ইন্ধনে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী উচ্ছ বিলাসী সেনাদল ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগষ্ট রাতের আধারে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। এদের কবল থেকে বঙ্গবন্ধুর নিস্পাপ শিশুপুত্র শেখ রাসেলও রেহাই পায় নি।
বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছেন।
বাংলাদেশের আন্দোলন, সংগ্রাম, স্বাধীনতা অর্জনে বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব,রাজনৈতিক জীবন ও কর্ম দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে তুলে ধরার অভিপ্রায়ে সরকার ইতিমধ্যে মার্চ ২০২০ থেকে মার্চ ২০২১ সময়কে ” মুজিববর্ষ ” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি ইউনেস্কো’র উদ্দোগে সারা বিশ্বে “মুজিববর্ষ” পালিত হচ্ছে।
“মুজিব বর্ষ” এর মাঝেই ভয়াবহ করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে হানা দিয়েছে। করোনা সংক্রমণের কারণে সারা বিশ্ব আজ স্থম্ভিত, আতঙ্কিত। সারা বিশ্বে ইতিমধ্যেই করোনা ভাইরাস সংক্রমিত কারণে ১৬ লাখের বেশী মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে এবং ৫ কোটির উপরে মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশও এরকম করোনা ভয়াবহতা এড়াতে পারেনি। বাংলাদেশেও ইতিমধ্য ৪ লাখের অধিক করুনা ভাইরাস সংক্রামণে আক্রান্ত, সাত হাজারের বেশী মানুষের মৃত্যু ঘটেছে, ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এতদ্বসত্বেও এবারের বিজয় দিবসে বাঙ্গালী জাতি পাচ্ছে সবছেয়ে বড় উপহার নিজস্ব অর্থায়ানে নির্মিত স্বপ্নের সেতু “পদ্মা সেতু”। এই সেতুর এক নম্বর স্প্যান হতে একচল্লিশ নম্বর স্প্যানগুলোর এক একটি স্প্যান সকল ষড়যন্ত্রের জবাব এবং প্রতিশোধের স্পৃহায় প্রতীক। ষড়যন্ত্রের নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ইতিমধ্যে বসানো শেষ স্প্যানটি জবাব দিচ্ছে আমি আমি বিজয়ী বাঙ্গালীর জাত, আমি সততা ও বীরের প্রতীক।
১৯৭৫ পরবর্তী সুদীর্ঘ্য ২১ বছর পর ১৯৯৬ সনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্টীয় ক্ষমতায় আসে এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে সরকার গঠন করে যার প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলে এবং সরকারের ঐ সময়ের মেয়াদকালীন সময়ে তিনি পদ্মা সেতুর শুভ সূচনা করেছিলেন।
কিন্তু অতীব দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ২০০১ সনে বিএনপি জামায়াত জোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়াটাই বন্ধ করে দেয়।
বিএনপি জামায়াত জোট সরকার আমলের প্রতিকুল পরিস্থিতি এবং তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও ধ্বংসাত্মক পথ পেরিয়ে ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে পূণরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে সরকার গঠন করে।
২০০৮ সনে জাতীয় নির্বাচনকালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কতৃক ঘোষিত নির্বাচনী ইস্তেহারে পদ্মা সেতু নির্মাণের জোর প্রতিশ্রুতি ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ২০১১ সালে ঋণদাতা সংস্থা গুলোর সাথে চুক্তি করে। বিশ্বব্যাংক স্বেচ্ছায় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ১২০ কোটি টাকা ঋণ প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং ঐ বছরের শেষদিকে কতিপয় দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীর ইন্ধনে বিশ্বব্যাংক কথিত দূর্নীতির ভূয়া অভিযোগ তুলে অর্থায়ন স্থগিত করে দেয়। সরকার পদ্মা সেতুতে দূর্ণীতির অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখান করলেও ২০১২সালে বিশ্বব্যাংক সম্পূর্ণ উদ্দ্যেশ্যজনকভাবে চুক্তটি বাতিল করে দেয়।
বিশ্বব্যাংকের এহেন অনাখাঙ্কিত এবং অযাচিত কর্মকান্ডে বিক্ষুদ্ধ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অতি দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্টভাবে ঘোষনা দেন যে, ” আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করবো, পদ্মা সেতু নির্মাণে আমাদের ১৬ কোটি মানুষ আর ৮০ লক্ষ প্রবাসীই যথেষ্ট। বাংঙ্গালী জাতি তথা বাংলার মানুষ কি সারাজীবন অন্যের সাহায্যে চলবে? তারা নিজের পায়ে দাড়াবে না? বংলার মানুষ কি আত্মনির্ভরশীল হবে না? পদ্মা সেতু আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে করবোই।
অপরদিকে, মালয়েশিয়া, চীন সহ বেশ কয়েকটি দেশ সহযোগিতা করতে চাইলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দেন,” আমাদের নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু হবে, আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করবোই।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা যোদ্ধত্তোর সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি কে যেমনিভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্থ বাংলাদেশকে সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রতায়ে দেশ পরিচালনা করেছিলেন, দেশকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন ঠিক তেমনিই ভাবে বঙ্গবন্ধু’র সূযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার শত্রু, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের শত্রু, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির প্রতি কোনরূপ তোয়াক্কা না করে তার প্রতি দেশের মানুষের ভালবাসাকে পূঁজি করে অদম্য সাহস, সুদৃঢ় মনোবল, বিচক্ষণ নেতৃত্ব নিয়ে তিনি দেশকে “ডিজিটাল বাংলাদেশ”-এ রুপান্তর করেছেন, উন্নয়নশীল দেশে পরিনত করেছেন। তাঁরই সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রুল মডেল।
মুজিববর্ষের বিজয় দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কতৃক প্রদত্ত বাংলাদেশের মানুষের জন্য সেরা গর্ব, অলংকার, অহঙ্কার পদ্মা সেতু। এক হতে একচল্লিশটি স্প্যানগুলোর সবগুলো বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এঁর প্রতি, ৩০ লক্ষ শহীদ আর দু’লক্ষ মা-বোনদের যারা মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রম হারিয়েছে তাদের প্রতি। বাংলাদেশ চিরজীবী হউক। মোঃ আব্দুল হান্নান রঞ্জন সহ-সভাপতি, নেত্রকোণা জেলা প্রেস ক্লাব।

 

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।