নেক্সাস পরিবারের সাথে টাঙ্গুয়ার হাওরে জোৎস্না বিলাস-শাহরিয়ার মজিব

সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ঝটিকা সফর হয়েছে বেশ ক’বার। যে ক’বার গিয়েছি ওখানে থিতু হতে না পেরে বুক ভার করা অতৃপ্তি নিয়েই বাড়ি ফিরেছি। অতৃপ্তি হবেই বা না কেন!
সর্বশেষ গেল বছরের শ্রাবণের বাদলা দিনে নেক্সাস রয়েল ক্লাবের চল্লিশ জনের একটা টিম নিয়ে ট্রলারে যাত্রা শুরু করলাম। যখনই আমাদের নৌকাটি ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করতে করতে হাওরের সীমানায় গিয়ে পড়লো, অমনি মেঘালয় রাজ্যের মেঘমালা পুরো আকাশটাকে মেঘমুক্ত করে স্নিগ্ধ রোদের হাসিতে আমাদের স্বাগতম জানালো।

চোখে পড়লো চারপাশ পাথরে বাঁধানো বাড়িঘর। এ বাড়ি থেকে ও-বাড়ি ডিঙি নৌকা করে মানুষজনের আনাগোনা। হাওরের ঢেউগুলো গিয়ে লাগছে বাঁধাই করা পাথরের উপর। কখনও একটি বাড়ি নিয়েই একটি গ্রাম। দূরের জনপদ গুলোকে দেখতে অনেকটাই দ্বীপের মতো লাগছে।
হরহামেশাই হিজল, করচ আর সামান্য কিছু বরুণ গাছের দেখা মিললো। উজানের পানি বানের জলের মতো ধেয়ে যাচ্ছে মেঘালয় রাজ্যের দিকে তবুও গাছগুলো পানির বুক চিরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। অপরূপ রূপ বৈচিত্র্য দেখে সবার মন তখন আনন্দে দোল খাচ্ছে।

আমাদের ঘড়ির কাটায় যখন ঠিক ২.১৫ মিনিট তখন নৌকাটি ভিরলো টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারটির পাদদেশে। সবাই দৌঁড়ে উঠল ওয়াচ টাওয়ারের সর্বোচ্চ সিঁড়ি পর্যন্ত। দুই-একজন ফটোশুটের জন্য ক্যামেরা তাক করলো। কেউ ব্যাগ থেকে দূর বিন বের করে যতদূর ল্যান্সের আওতায় আসে এক পলকে দেখে নিল। আবার দুর্দান্ত সাহসী ক’জন ওয়াচ টাওয়ার থেকে লাইফ জ্যাকেট পরে লাফিয়ে পড়লো হাওরের স্বচ্ছ নীল পানিতে। বাকিরা যে যার মতো কিছুক্ষণ পানিতে সাঁতরে নিল।

খেয়ে নিলাম দুপুরের খাবার। শুরু হলো নানান প্রতিযোগীতা। সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো প্রতিভার ঝলক দেখাতে। আবৃত্তি, কৌতুক আর কেউ কেউ আবার সেলিব্রিটিদের নকল করেও দেখালো।সর্বশেষে একজন বাংলাবিদ আবৃত্তি করলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কেউ কথা রাখেনি” কবিতাটি।সকলেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। চমৎকার আবৃত্তি শুনে মনে হয়েছিল উনার বোধহয় জন্মই হয়েছে কবিতা আবৃত্তির জন্য!

ততক্ষণে চারদিকেই ছড়িয়ে পড়েছে গোধূলি বিকেলের আলো।
প্রতিটা জিনিসেরই একটা প্রতিবিম্ব থাকে। আকাশের স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব আমি প্রথম দেখলাম টাঙ্গুয়ার হাওরে। হাওরের জলে তাকালে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে শিমুল তুলার মতো ঘন ঘন মেঘ। যেন ওগুলো আকাশে উড়ছে না, হাওরের জলে ভাসছে। একটু পরপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে ওরা হাওরের জলে ডুবসাঁতার দিচ্ছে। আমি জলে তাকিয়েই আকাশ, পাখি, মেঘ সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। শুনেছি শীতকালে নাকি ওখানে সাইবেরিয়া থেকে পালকে বরফ জড়িয়ে প্রচুর অতিথি পাখি আসে। বর্ষায় গিয়েছিলাম বলে ওদের আর দেখা মিলেনি।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, হাওরে যখন সন্ধ্যা নামলো, সেটা পৃথিবীর বাকি সমস্ত সন্ধ্যা থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। নৌকায় চড়ে হিজল বনের ভিতর দিয়ে আস্তে আস্তে আমরা ঐ সন্ধ্যার ভেতর ঢুকে পড়লাম। হাওরের শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু পাহাড়গুলো হঠাৎ কান্না শুরু করলো, অন্যদিকে দূর থেকে এক সারি হিজল গাছ মৃদু বাতাসে হাত নেড়ে তাদের সান্ত্বনা দিতে লাগলো। মাঝখানের অথৈ জলরাশি নিজের মতো খেলা করে যাচ্ছে অবিরাম।

তখন রাত।
আমরা নৌকার ভিতর সামান্য বিশ্রাম নিচ্ছি। মাথার উপরে একফালি চাঁদ। চাঁদের রূপোলি জোৎস্না জানলা গলে নৌকার ভিতরে ঢুকে পরছে। জোৎস্না দেখতে নৌকার বাইরে বেড়িয়ে এলাম। টাঙ্গুয়ার হাওরের কোন একটা জায়গায় আমাদের নৌকাটা ভাসছে। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না। ফকফকে জোৎস্নায় হাওরের পানি যেন আমার ছোট বোনের রুপার পায়েলের মত চিকচিক করছে। শাপলা আর পদ্মফুলের গা থেকে ফড়িং উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটাও আমার চোখে সুস্পষ্ট ভাবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই অপরূপ দৃশ্যপট দেখে আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত ধরলাম…
“চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে,উছলে পরে আলো….”।
গান শেষ করে পাটাতনে শুয়ে লক্ষ লক্ষ তারার দিকে তাকিয়ে আছি। দূরে কোন এক মাঝি হয়তো আমার গলা শোনেই হাঁক ছেড়ে শাহ আব্দুল করিমের গান ধরলেন,
“কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি…”।
আজকাল মন খারাপের দিনে যখন নিজেকে ঐ জায়গায় দাঁড় করাই তখন সমস্ত কষ্টেরা ভঙ্গুর হয়ে যায়।

কখনও সমুদ্রে যাইনি তবে শুনেছি সমুদ্র খুব অহংকারী। সমুদ্র তার বুকে আকাশকে জায়গা করে দেয়না। এজন্য সমুদ্রে কোন প্রতিবিম্ব তৈরি হয়না।সি-বিচের লোনা পানিতেও নাকি নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি মধুচন্দ্রিমায়(হানিমুনে) সমুদ্রে না গিয়ে ফের হাওরের কাছেই যাব।

শাহরিয়ার মজিব
ইংরেজী বিভাগ
অনার্স ৪র্থ বর্ষ
আনন্দ মোহন কলেজ,ময়মনসিংহ।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।