করোনার প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়নি নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলে

স্টাফ রির্পোটার: করোনার প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়নি দুর্গম হাওরাঞ্চলে। একটি গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের দূরত্ব পাঁচ থেকে দশ কিলোমিটার হওয়ার তেমন সাড়া পড়েনি স্থানীয়দের মাঝে। এখনো করোনা’র ভয়াবহ বার্তা জানেনা হাওরপাড়ের মানুষজন। তবে নেত্রকোনার শহরাঞ্চলে সেনা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নেমেছে। এদিকে কাজের সন্ধানে ঘর ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে ছুটেচলা দিন মজুররা পড়েছে বিপাকে। নিয়ম ভেঙ্গে ত্রাণ নিতে ভীড় জমাচ্ছেন দরীদ্র নারীরা।
এরিমধ্যে সরকার করোনার প্রভাব বিস্তার রোধে বিদেশ ফেরত ও ঢাকা ফেরত লোকজনকে হোম কোয়ারেনটাইনে থাকার পাশাপাশি সকল সরকারী বেসরকারী অফিস আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাট বন্ধ ঘোষণা করে সাধারণ লোকজনকে নিজ নিজ ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে নেত্রকোণায় বিদেশ ফেরত ৮৩৫ জনকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, জেলায় মোট বিদেশ ফেরত ১০৪৩ জনের মধ্যে ২০৮ জনকে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ রাখা হয়েছে। এরমধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনের চৌদ্দ দিন সময় পার হওয়ায় ৯০ জনকে রিলিজ দেয়া হয়েছে। বিদেশ ফেরত ব্যক্তিরা ইতালি, চীন, ওমান, দুবাই, সিঙ্গাপুর, জর্দান, মালয়েশিয়া, স্পেন, অস্টেলিয়া সৌদিআরব, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত।
সূত্র আরো জানায়, নেত্রকোণা সদর উপজেলায় ৪৪ জন, পূর্বধলায় ৪, দুর্গাপুর ১৮,কলমাকান্দায় ২২,বারহাট্টায় ১৮, মোহনগঞ্জে ৪৬, মদনে ৪, খালিয়াজুরী ৫ আটপাড়ায় ১৬ জনকে ‘হোম কোয়ারেন্টাইনে’ রাখা হয়েছে। বাকি ৮৩৫ জনের এখনো সন্ধান করতে পারেনি জেলার স্বাস্থ্য ও পুলিশ বিভাগ।
এদিকে সরকারী নির্দেশনায় সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে নিন্ম আয়ের সাধারণ মানুষ। যারা দিন এনে দিন খায় তাদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। শনিবার সকালে শ্রমিকদের হাট হিসেবে পরিচিত জেলা শহরের তেরী বাজার মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনের ন্যায় নিন্ম আয়ের মানুষ বিশেষ করে দিন মজুর শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে রাস্তায় অবস্থান করছে। মইনপুর গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক ফজলু মিয়া বলেন, “সংসারে স্ত্রী ও তিন সন্তান রয়েছে। একদিন কাজ না করলে তাদের সংসারে দু’বেলা দুমুটো খাবারও জুটবে না। করোনার ভয় থাকলেও ছেলেমেয়েদের মুখের পানে চেয়ে আমি কাজের সন্ধানে ঘর ছেড়ে বেড়িয়েছি।” চল্লিশার শ্রীধরপুর গ্রামের ইজিবাইক চালক রাজু মিয়া বলেন, “আজ দুদিন যাবৎ শহরে ইজিবাইক নিয়ে বের হতে পারছিনা। বের হলেই পুলিশ আমাদেরকে বকাঝকা ও মারধর করে। সরকার আমাদের জন্য স্বল্পমূল্যে চাল, ডাল, তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করলে আমরা বেঁচে থাকতে পারবো।”
খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের গ্রামের স্বাগত সরকার সরকার শুভ, একই উপজেলার নগর ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামের প্রণজিত সরকার, কৃষ্ণপুর গ্রামের রণি আহমেদ, চাকুয়া গ্রামের শিপার রায় বলেন, “হাওরাঞ্চলের মানুষ এখনো এত সচেতন না। এখনো দোকানে চায়ের স্টলে আড্ডা দিচ্ছে লোকজন। কোনো জনপ্রতিনিধি এখনো এবিষয়ে কোনো নির্দেশনা দিচ্ছেনা। সরকারী নির্দেশনা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো পৌঁছেনি। একটা গ্রাম থেকে আরেকটা গ্রামের দূরত্ব অনেক। সব গ্রামে যাতায়তের সুযোগও নেই। গার্মেন্টেস ফেরত লোকজন বাড়িঘরে পৌঁছে অবাধে চলাফেরা করছে। এজন্য গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশি ঝুঁকিতে।”
মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর গ্রামের কাজল চৌধুরী জানান,“শহরের লোকজনের মত গ্রামে এখনো করোনার খবর পায়নি লোকজন। কেউ এখনো বিশ্বাস করতে চায়না। গ্রামের সহজ সরল মানুষকে সচেতন করা দরকার। নয়তো ভয়াবহ অবস্থা হতে পারে।”


খালিয়াজুরী উপজেলার বোয়ালী গ্রামের নয়ন মিয়া বলেন,“আজ সকালে পুলিশ এসেছিল। আজ থেকে কিছুটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। প্রশাসন কিংবা পুলিশ না বললে মানুষ বিশ্বাস করতে চায়না।জন প্রতিনিধি রাজনৈতিক দলের নেতারা বললে মানুষ আরো সচেতন হবে।”
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন,“শনিবার উপজেলার মেন্দিপুর এলাকায় কয়েকটি দোকানে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে যাচ্ছি। আমরা উপজেলার হাট বাজার গুলো নিয়মিত জনসচেতনা সৃষ্টি করছি। সরকারের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছি। করোনার বিষয়ে আতংকিত না হয়ে সচেতন হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
১৯ পদাতিক ডিভিশনের ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন এ এইচ এম আতিকুল হক জানান, “সরকারী নির্দেশে স্থানীয় প্রশাসনকে সহযোগিতার পাশাপাশি জনগণের মাঝে করোনা সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সরকারী নির্দেশ মানতে জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করতেই তারা মাঠে নেমেছেন। প্রাণঘাতী করোনা মোকাবেলার একমাত্র সঠিক পথ হচ্ছে জনগণকে ঘরে থাকা। যারা ঘরে থাকবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। হত-দরিদ্র ও নিন্ম আয়ের লোকজনের কল্যাণে সরকার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করলে সেনাবাহিনী সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। নেত্রকোণা সদর উপজেলায় এক প্লাটুন এবং আটপাড়া উপজেলায় আরেক প্লাটুন সদস্য টহল দিচ্ছে। ”
নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক মঈনউল ইসলাম বলেন, “যারা দরিদ্র, খেটে খাওয়া মানুষ তাদেরকে ইতিমধ্যে আমরা চাল বিতরণ শুরু করেছি। স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তালিকা করে দ্ররিদ্র মানুষকে সহযোগিতার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর হাওরাঞ্চলের বিষয়ে জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মাইকিং ও লিটলেট বিতরণ করে সচেতনতার কাজ চালিয়ে যেতে।”

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।