কলমাকান্দায় স্বেচ্ছাশ্রমে তিন কিলোমিটার সড়কের কাজ শেষ

বিশেষ প্রতিনিধি: মাত্র তিন কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের জন্য স্থানীয় সাংসদ ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বারবার ধরনা দিয়েছেন গ্রামবাসী। সবাই রাস্তা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর কেউ রক্ষা করেননি।শেষে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়াম্যান উদ্যোগী হয়ে এলাকাবাসীদের নিয়ে নিজেরাই রাস্তাটি বানিয়েছেন।
নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার লেংগুড়া ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গৌরীপুর সেতুসংলগ্ন থেকে তারানগর পর্যন্ত তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এ রাস্তা বানিয়েছেন গৌরীপুর, তারানগর, বালুচরা, কেবালপুর, এয়ারপুর, ভবানীপুর, গোরাগাও, চৈতনগরসহ অন্তত সাতটি গ্রামের লোকজন।
সরকারি বরাদ্দের আশায় বসে না থেকে গত শনিবার সকাল থেকে গ্রামগুলোর আদিবাসী নারীসহ কিশোর, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, যুবক, বৃদ্ধ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সহস্রাধিক মানুষ কোদাল, টোপর ইত্যাদি প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে সড়ক নির্মাণে মাটি কাটার কাজ শুরু করেন।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, রাস্তাটি নির্মাণের জন্য এলাকার লোকজন বিগত সময়ে চেয়ারম্যান, সাংসদ ও সরকারি দপ্তরে বহুবার যোগাযোগ করেছেন। ভোটের সময় আশ্বাস মিললেও পরে আর কেউ খোঁজ নেননি। অবশেষে লেঙ্গুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া উদ্যোগী হয়ে সরকারি অনুদান ও বরাদ্দের আশায় না থেকে নিজেরাই রাস্তা নির্মাণকাজ গতকাল বুধবার শেষ করেছেন। একটি সড়কের কারণে গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। শিক্ষার্থীরা পায়ে হেঁটে অনেক দূরে স্কুল-কলেজে যেতে হয়। তা ছাড়া গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত শস্য কম দামে বিক্রি করতে হয়।
চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘ইউপির বরাদ্দ থেকে চাহিদামাফিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করা সম্ভব হয় না। সরকারিভাবে সড়ক নির্মাণের অর্থ না পাওয়ায় জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে তাঁদেরকে সঙ্গে নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে এই তিন কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ করেছি। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে। আমার মতো এ ভাবে সরকারি বরাদ্দের আশায় বসে না থেকে অন্যান্য অবহেলিত এলাকায় ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা উদ্যোগী হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলে যাবে। তিনি জানান, এই রাস্তা দিয়ে কলমাকান্দা উপজেলা সদর, লেঙ্গুরা বাজারে ইউপি কার্যালয়, স্বাস্থ্য কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, দুটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
বালুচড়া সেক্রেট হার্ট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির সাদিয়া আক্তার, ইতি আক্তার ঐশী হাজং, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারমিন সুলতানা প্রমুখ জানায়, ‘রাস্তা না থাকায় এত দিন বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার বেশি পথ ঘুরে আমাদের স্কুলে যেতে হতো। পায়ে হেঁটে গেলে স্কুলে যাওয়া-আসা করতেই দুই ঘণ্টার বেশি সময় চলে যায়। কিন্তু এখন মাত্র কিছুটা পথ পাড়ি দিলেই স্কুলে পৌঁছে যাব।’
বালুচড়া মিশনের ফাদার যোশেফ চিসিম বলেন, ‘চেয়ারম্যান ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমি নিজেও অন্যদের সঙ্গে সড়কে মাটি কেটেছি। আমাদের দেশটাকে উন্নত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এভাবে সকলেই মিলে যদি ভালো কাজ আমরা করতে পারি তবে সহজেই দেশটি বদলে যাবে।’
সেক্রেট হার্ট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চার্ল্স চারু নকরেক বলেন, ‘এই রাস্তাটি এলাকার মানুষদের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল। এখন আমাদের বাচ্চারা সহজেই স্কুলে আসতে পারবে। এলাকার চেহারাটিও পাল্টে গেছে।’
কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘আমি গত মঙ্গলবার স্বেচ্ছাশ্রমে নবনির্মিত রাস্তাটি দেখে এসেছি। এটি একটি সুন্দর ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। চেয়ারম্যান সাইদুর রহমানকে সাধুবাদ জানাই। এ ভাবে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগী হয়ে ভালো কাজ করলে একটি সত্যিকারের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তিনি জানান, এই সড়কটি পাঁকাকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বরাবর প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।’

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।