কেন্দুয়ায় প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল

স্টাফ রির্পোটার: নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের কাছে উত্তর সরবরাহ করার চাঞ্চল্যকর ঘটনার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর ছয় মাস তদন্ত করে পুলিশ পরিদর্শক মো.রফিকুল ইসলাম মামলার এজাহারনামীয় ৩৭ জন আসামিসহ প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের ৩৮ সদস্যকে অভিযুক্ত করে বৃহষ্পতিবার এ অভিযোগপত্র নেত্রকোনা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করেন।
চার্জশিটে অভিযুক্তরা সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীদের স্বজনেরা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
চাঞ্চল্যকর মামলাটির অভিযোগপত্র দাখিল সম্পর্কে মামলার তদারকির দায়িত্বে থাকা নেত্রকোণার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মাদ শাজাহান মিয়া শুক্রবার বিকেলে জানান, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং এর উত্তর পরীক্ষার্থীদের সরবরাহের বিষয়টি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ ও পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন-১৯৮০-ধারায় মামলটি দায়ের করা হয়। এটি দেশের একটি আলোচিত ঘটনা। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্র জানায়, সর্বশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা চলাকালে গত ২৮ জুন অভিযুক্তদের আটক করা হয়। তারা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং এর উত্তর পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করার সময় কেন্দুয়া পৌরসভার টেঙ্গুরি-ছয়আনী এলাকার বাসিন্দা শিল্পপতি মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া শামীমের বাড়ি থেকে নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্র সরবরাহকালে অভিযান চালিয়ে পুলিশ প্রশ্নপত্র ফাঁসচক্রের ৩২ সদস্যকে আটক করে। ওই সময় তাদের কাছ থেকে কয়েকটি মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও প্রিন্টারসহ ইলেকট্রনিকস ডিভাইস ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
ঘটনার দিন আটক ৩২ জনের মধ্যে ১২জন নারী ছিলেন। নারীদের মধ্যে ৯ জন ছিলেন বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক। ওই ৯ নারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। অন্যদিকে আটক পুরুষদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন দু’জন। আটকদের মধ্যে ঘটনার অন্যতম হোতা কেন্দুয়া উপজেলার বলাইশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নান ছোটনসহ তার আত্মীয় পুরাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সাকিকেও ৩০ জুন সাময়িক বরখাস্ত হয়। এ ছাড়া ওই সময় আটক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন দু’জন। আর বাকীরা ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ কলেজের শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীদের স্বজন।
পরে এ ঘটনায় কেন্দুয়া থানায় একটি মামলাটি দায়ের করা হয়। কেন্দুয়া থানার উপপরিদর্শক আবুল বাশার বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ ও পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন-১৯৮০-এর দুটি পৃথক ধারায় মামলা করেন। ওই মামলায় প্রশ্নপত্র চক্রের অন্যতম হোতা বলাইশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (পরে ৩০ জুন সাময়িক বরখাস্ত) আবদুল মান্নান ওরফে ছোটনকে প্রধান করে ৩৭ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো ৫০-৬০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারনামীয় আসামির তালিকায় ঘটনার দিন আটক ৩২ জন ছাড়াও চক্রের অপর সদস্য নেত্রকোনা সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মোমেন খান, নেত্রকোনা সদরের উন্মেষ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আরিফুল ইসলাম রিপন ও কৃষ্ণগোবিন্দ হাই স্কুলের ঝন্টুও রয়েছেন।
অপর দিকে তিনজন প্রধান শিক্ষক হলেন-কেন্দুয়ার বলাইশিমুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মান্নান, পুরাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুস সাকি, পানগাও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুহিন আক্তার।
এছাড়াও কেন্দুয়ার দিগদাইর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান, নওয়াপাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাওয়া বেগম, একই বিদ্যালয়ের নিপা মোনালিস, বলাইশিমুল বিদ্যালয়ের শিক্ষক মরিয়ম আক্তার, কেন্দুয়া মডেল বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাহমিনা আক্তার, আটপাড়ার তেলিগাতি বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্মৃতি খানম, মদনের খাগুরিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক লাকি আক্তার, মদনের জঙ্গল টেংগা বিদ্যালয়ের শিক্ষক জেবুন্নাহার ডলিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা পরবর্তীতে জেল খেটে এবং বাকীরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ অবস্থায় পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে চাঞ্চল্যকর এ মামলার এজাহারনামীয় সকল আসামিসহ ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কেন্দুয়া থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ তদন্ত শেষে উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ এবং এর উত্তর পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এতে মামলার এজাহারনামীয় ৩৭ আসামিসহ কেন্দুয়া উপজেলার নওপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন অফিস সহায়ককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামানও চাঞ্চল্যকর এ মামলায় এজাহারনামীয় ৩৭ আসামিসহ ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।