কলমাকান্দায় বাঁশের সাঁকোতে জীবনভর ঝুঁকি নিয়ে পারাপার!

বিশেষ প্রতিনিধি: জন্মের পর কেউ-ই কখনো গ্রামের যোগাযোগের প্রধান ও একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থায় মঙ্গেলেশ্বরী নদীর উপরে কোনো ব্রিজ দেখেননি। তাই জীবনভর ঝুঁকি ছাড়া কখনো চলাচলের সুযোগ হয়নি গ্রামবাসীর। প্রত্যেকে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে একটি বাঁশে ধরে পাড় হচ্ছেন প্রতিদিন।
মঙ্গেলেশ্বরী নদীটি নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর, কায়তাপুর, শ্রীপুর, বিলপাড়সহ ১০/১২ টি গ্রামকে অন্যান্য সবকিছু থেকে আলাদা করে রেখেছে।
ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে এসেছে মঙ্গেলেশ্বরী নদী। গ্রামগুলোর বুক চিরে বয়ে চলা এই নদীটি ডিঙিয়েই সকল বয়সের পঞ্চাশ হাজার মানুষের যাতায়াত করতে হয় প্রতিদিন।
স্থানীয়রা জানায়, উন্নয়নের ছোঁয়া বঞ্চিত জীবন ধারায় পিছিয়ে থাকা গ্রামের মানুষদের বাঁশে ঝুলে নদী পার হওয়ার দুঃসাহসিকতা আর দুর্ভোগের যেন কোনো অন্ত নেই।
বাড়িঘর, হাট-বাজার, কর্মস্থল বা শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে প্রত্যেককে একটি বাঁশ বেয়ে নদীটি পার হতে হয়। আর পার হতে গিয়ে কখনো কেউ হয়েছেন রক্তাক্ত, ভেঙেছেন হাত-পা কখনো বা কারো কোমর!
এমনিতে একজন সুস্থ মানুষ সাহস সঞ্চার করে বাঁশে ঝুলে কোনোরকম নদী পার হন। তবে ভয়াবহ দৃশ্যের সৃষ্টি হয় আরও অসুস্থ ব্যক্তিকে পারাপারের সময়।
নিজেদের দুর্ভোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক জানান, ব্রিজ না থাকায় বড় হাড়িতে গর্ভবতী মাকে বসিয়ে সেই হাড়িতে রশি বেঁধে নদী পাড়ি পার করতে হয়েছে! পরিস্থিতিতে রোগীর স্বজনরাও চোখে কিছু দেখেন না সর্ষে ফুল ছাড়া!
বৈঠাখালি ও বিশ্বনাথপুর গ্রামের বিভিন্ন পাড়ার বাসিন্দা আবু সাহেদ (৮৫), ইউসুফ আলী (৮০), আব্দুল হামিদ (৭৮), লোকমান হেকিম (৬০), রফিকুল ইসলাম (৪৮), আমেনা খাতুন (৬০) ও সেনোরা বানু(৫৬)।
তাদের অভিযোগ, বছর আর যুগের পর যুগ পার হলেও গ্রামবাসীকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে আজও ফিরে তাকায়নি কোনো জনপ্রতিনিধি! হোক তিনি স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ের বড় কোনো নেতা।
তারা আরো জানান, দেশজুড়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড অব্যাহত রয়েছে। অথচ কি কারণে আর কোন অপরাধে তাদের গ্রামে আজও এই করুণ পরিণতি বইছে তা কেউ বলতে পারেন না। সরকার নির্বাচিত করতে আর সবার মতো তারাও ভোট দেন তবে কেন এই বৈষম্যতা?


ওই গ্রামের সাহেদ, হেকিম জানান, মঙ্গেলেশ্বরী নদীর সংযোগস্থলে পূর্বে গ্রাম রয়েছে বামনগাঁও, কান্দাপাড়া ও বাওসাম এবং পশ্চিমে রয়েছে বিশ্বনাথপুর, কায়তাপুর, শ্রীপুর, বিলপাড়। এসব গ্রামের ছেলে মেয়েদের ভালো এলাকায় বিয়ে শাদি পযন্ত দেয়া যায় না। ছোট একটি মাত্র ব্রিজ না থাকার কারণে করুণ পরিণতি সকল গ্রামবাসীর।
খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আ’লীগ নেতা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ব্রিজের প্রয়োজনীয়তা ও না থাকায় সমস্যার দিকগুলো তোলে ধরে এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে উপজেলার সমন্বয় সভায় বারবার জানানো হয়েছে।
কিন্তু কোনোক্রমে কোথাও কোনো সুদৃষ্টি ফেরানো সম্ভব হয়নি। অথচ ৫০ মিটারের ছোট্ট এই একটি ব্রিজ নির্মাণ হলে অনেক সহজতর হতো গ্রামবাসীর যোগাযোগ ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক দিকে আসতো সচ্ছলতা। কিন্তু কেউ ভাবেননি সেসব কথা।
খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ওবায়দুল হক জানান, সমস্যা কাটিয়ে উঠার জন্য ব্রিজ করাতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন তিনি।গ্রামবাসীর এই দুর্ভোগে তিনি নিজেও লজ্জিত। কিন্তু উপজেলা পরিষদসহ সকল সমন্বয় সভায় বারবার বলেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
কলমাকান্দা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, আগামীকালকের মধ্যে এলাকাটি পরিদর্শন করা হবে। পরে প্রয়োজন সাপেক্ষে সংসদ সদস্য (এমপি) এর সাথে পরামর্শক্রমে ব্রিজ করে দেয়া হবে।

শর্টলিংকঃ
সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। পাঠকের মতামতের জন্য কৃর্তপক্ষ দায়ী নয়। লেখাটির দায় সম্পূর্ন লেখকের।